জহিরুল ইসলাম রাতুল।। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারে যখন ক্যালেন্ডারের পাতায় ‘মা দিবস’ উঁকি দেয়, তখন বিশ্বজুড়ে শুরু হয় কৃতজ্ঞতার আনুষ্ঠানিক উৎসব। একগুচ্ছ ফুল, দামী উপহার কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সপ্রতিভ ছবি কি সেই মানুষটির ঋণের ভার লাঘব করতে পারে, যাঁর ত্যাগের খতিয়ান কোনো পার্থিব অংকে মেলে না? এক দিনের সাময়িক জোয়ারে কি ধারণ করা যায় জননীর আজীবনের ম্যারাথন সংগ্রামকে? মাতৃত্ব কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি চিরন্তন দর্শন যা উৎসর্গ আর অস্তিত্বের এক গভীর মেলবন্ধন।
কন্যা থেকে জননী: এক মৌন রূপান্তরের আখ্যান
একজন নারী যখন কন্যা রূপে বেড়ে ওঠেন, তাঁর চোখে থাকে নিজস্ব আকাশ ছোঁয়ার রঙিন স্বপ্ন। কিন্তু মাতৃত্বের পরশ লাগার সাথে সাথেই সেই স্বপ্নের মানচিত্র আমূল বদলে যায়; সেখানে নিজের সত্তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সন্তানের ভবিষ্যৎ। গর্ভধারণের সেই প্রথম মুহূর্তটি থেকেই শুরু হয় এক মহাজাগতিক ও নিঃশব্দ যুদ্ধ। এটি কেবল শারীরিক পরিবর্তন নয়, বরং এক মানসিক বিপ্লব। শরীরের প্রতিটি কোষে চলে আমূল পুনর্গঠন, আর মনের অলিগলি জুড়ে দানা বাঁধে এক অদৃশ্য সুরক্ষাবালয়।
সমাজ মাতৃত্বকে ঘিরে যে পাহাড়সম প্রত্যাশার বোঝা তৈরি করে দেয়, একজন মা তা হাসিমুখে গ্রহণ করেন। নয় মাসের সেই সুদীর্ঘ পথচলা কেবল সময়ের হিসেব নয়; বরং তা সহনশীলতা, অন্তহীন ভয়, আর অদম্য ভালোবাসার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। এই রূপান্তরটি অলৌকিক, কারণ এখানে একজন মানুষ নিজের অস্তিত্বের ভেতরে আরেকজন মানুষকে প্রাণ দেয় এবং ধীরে ধীরে নিজের প্রয়োজনগুলোকে গৌণ করে তোলে।
মাতৃত্বের ত্যাগ: অদৃশ্য এক জীবনাহুতিএকজন মা তাঁর সত্তার কতটুকু বিসর্জন দেন, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
তবু জীবনের ক্যানভাসে সেই ত্যাগগুলো চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকে:• স্বপ্ন ও ক্যারিয়ারের বিসর্জন: অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজের লালিত ক্যারিয়ার বা শখের জগতকে অবলীলায় তুচ্ছ করেন তিনি। তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্যের আকাঙ্ক্ষাগুলো সন্তানের প্রথম কথা বলা বা প্রথম হাঁটার আনন্দের কাছে ম্লান হয়ে যায়।• বিশ্রামহীন প্রহর: নিজের শারীরিক ক্লান্তি বা অসুস্থতাকে আড়াল করে রাতের পর রাত সন্তানের শিয়রে জেগে থাকা তাঁর জীবনের অলিখিত নিয়ম। তিনি ঘুমোন সবার শেষে আর জেগে ওঠেন সবার আগে।• অব্যক্ত আর্তনাদ: আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে মায়ের ত্যাগের রূপ ভিন্ন। গ্রামের অভাবী মা নিজের আহার কমিয়ে সন্তানের মুখে অন্ন তুলে দেন, আর শহরের কর্মজীবী মা অফিস ও সংসারের দ্বৈত ভার কাঁধে নিয়ে হাঁটেন এক নিঃসঙ্গ পথে। এই লড়াইটি যেমন নীরব, তেমনই সুতীব্র।
সন্তানের প্রতিদান: ভালোবাসা নয়, শ্রদ্ধার অধিকার
মাতৃত্ব কেবল একপাক্ষিক বিলিয়ে দেওয়ার নাম নয়। সন্তানের দায়িত্ব এখানে কেবল ক্ষণিকের আবেগে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা এক নৈতিক আবশ্যকতা। মা আমাদের ছায়া দেন বলেই আমরা তাকে অবহেলা করতে পারি না। মনে রাখতে হবে, মা কেবল কোনো যন্ত্র বা সেবাদাত্রী নন; তিনি রক্ত-মাংসে গড়া এক মানুষ, যাঁর নিজস্ব ক্লান্তি, অবসাদ ও স্বপ্ন আছে।সন্তান হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতা কেবল উৎসবের দিনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মায়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সার্বক্ষণিক খোঁজ রাখা, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে তাঁর মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া এবং বার্ধক্যের গোধূলি বেলায় তাঁর হাতটি শক্ত করে ধরে রাখা আমাদের প্রধান কর্তব্য। শৈশবে তিনি যেভাবে আমাদের পৃথিবী চিনিয়েছেন, বার্ধক্যে আমাদের উচিত তাঁর পৃথিবীকে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করা।
আদর্শের পাঠশালা ও সমাজের রূঢ় বাস্তবতা
মা-ই সন্তানের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাঁর আঁচলের তলাতেই সন্তান শেখে নৈতিকতা, মানবিকতা আর সহমর্মিতার আদি পাঠ। অথচ আমাদের সমাজ মাতৃত্বকে যতটা মহিমান্বিত করে মুখে, বাস্তবে ততটাই অবজ্ঞা করে। গৃহিণী মায়েদের হাড়ভাঙা খাটুনিকে ‘কাজ নয়’ বলে তুচ্ছ করা হয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। কর্মজীবী মায়েদের প্রতিনিয়ত দ্বিগুণ চাপের আগুনে পুড়তে হয়, যেখানে তাঁদের কাজের মূল্যায়ন প্রায়ই ব্যক্তিগত ত্যাগের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধ মায়েদের কপালে শেষ জীবনে জোটে অবহেলা আর লাঞ্ছনা, যা সভ্য সমাজের জন্য এক বড় পরাজয়।
আগামীর অঙ্গীকার: উৎসব থেকে উপলব্ধিতে
মা দিবস কেবল একদিনের উৎসব নয়, এটি এক গভীর উপলব্ধির নাম। মাতৃত্ব কোনো অলংকার নয়, এটি এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম।
তাই আজকের দিনে আমাদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি কেবল যান্ত্রিকভাবে ‘ধন্যবাদ’ জানিয়ে দায় সারব, নাকি তাঁর প্রাপ্য সামাজিক স্বীকৃতি ও হৃদয়ের গহীন থেকে আসা সম্মানটুকু ফিরিয়ে দিতে পারব? প্রতিটি দিনই হোক মায়ের জন্য, আর আমাদের প্রতিদিনের আচরণে ফুটে উঠুক সেই কৃতজ্ঞতার প্রতিফলন।
“মায়ের ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু তাঁকে যথাযথ সম্মান ও সময় দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মা দিবসের সার্থকতা লুকিয়ে আছে প্রতিদিনের ভালোবাসায়।
Copyright © 2022 KhulnarKhabor.com মেইল:khulnarkhobor24@gmail.com।জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা আইনে তথ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিবন্ধন আবেদিত।স্মারক নম্বর:- ০৫.৪৪.৪৭০০.০২২.১৮.২৪২.২২-১২১।এই নিউজ পোর্টালের কোন লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।